কুড়ুমবেড়া দুর্গ
কুড়ুমবেড়া দুর্গ কেশিয়াড়ী থেকে দক্ষিণ-পূর্বে প্রায় চার কিলোমিটার দূরে দক্ষিণে গগেনেশ্বর গ্রামে অবস্থিত।খড়গপুর শহর থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরে কুড়ুমবেড়া অবস্থিত।বেলদা শহর থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে কুকাই বাজার থেকে প্রায় ৩ কিলোমিটার গেলে কুড়ুমবেড়ায় পৌঁছনো যাবে। দুর্গটি ভারতের পুরাতত্ব সর্বেক্ষণের অধীনে একটি সংরক্ষিত প্রাচীন ঐতিহাসিক স্থল।উড়িষ্যার সূর্যভামসি (সূর্যবংশী)গজপতি বংশের প্রথম রাজা কপিলেন্দ্র দেবের শাসনকালে দুর্গটির নির্মাণ শুরু হয়। পরবর্তী রাজা পুরুষোত্তম দেবের আমলে নির্মাণ সম্পন্ন হয়। দুর্গটি ১৪৩৮-১৪৬৯ খ্রিষ্টাব্দে নির্মিত বলে একস্থানে ওডিয়া শিলালিপিতে উৎকীর্ণ আছে।এখানে ওরঙ্গজেবের সমসাময়িক মোহাম্মাদ তাহিরের ( শিলালিপি) সময় নির্মিত কাঠামোও রয়েছে। আরকিওলজিকাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার অধীনস্থ ঐতিহাসিক স্তম্ভ হলেও , এটিতে আদর্শ দুর্গের কোনও বাহ্য বৈশিষ্ট্যগত মিল নেই। ১৫৬৮ খ্রিস্টাব্দে বাংলার ও বিহারের আফগান সুলতান ওড়িশা আক্রমণ করে, বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের অবিভক্ত মেদিনীপুর জেলার এই স্থানটিও ওড়িশা -রাজের অন্তর্ভুক্ত ছিল। ১৫৭৫ খ্রিস্টাব্দের ৩রা মার্চ তুকারোর যুদ্ধে মুঘলরা বাংলার আফগানদের পরাজিত করে ওড়িশা দখল করে।এই যুদ্ধ বাঝৌরার যুদ্ধ বা মোগলমারীর যুদ্ধ নামেও খ্যাত। মুঘলরা ওড়িশা সুবাকে পাঁচটি সরকারে বিভক্ত করে। এই অংশটি জলেশ্বর সরকারের অন্তর্ভুক্ত ছিল।একটি সূত্র অনুসারে, ওরঙ্গজেবের আমলে কুড়ুমবেড়া দুর্গ ও মন্দির কমপ্লেক্স আক্রমণ ও মসজিদে রূপান্তরিত হয়েছিল বলে মনে করা হয়। ১৭৫২ খ্রিষ্টাব্দে মেদিনীপুর অঞ্চল ওড়িশা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে মুসলিম নবাব শাসিত বাংলার অন্তর্ভুক্ত হয় ।
দুর্গটির কাঠামোয় উড়িষ্যার মধ্যযুগীয় স্থাপত্য এবং পরবর্তীকালে মুঘল স্থাপত্যের সংমিশ্রণ লক্ষিত হয়। এই দুর্গটিতে একটি প্রস্তর বেদীর উপরে একটি তিনটি গম্বুজযুক্ত কাঠামো রয়েছে।এই দুর্গের বেশিরভাগ অংশ এবং তার কাঠামো ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে। পুরাতত্ব সর্বেক্ষণ স্তম্ভগুলিতে সিমেন্ট এবং চুন ব্যবহার করে কাঠামোগুলি রক্ষা করার প্রচেষ্টা নিয়েছে । স্তম্ভ গুলির জোড়ন-বিন্দু গুলি পদ্মফুলের আকৃতি নিয়েছে। ঊর্ধ্বাংশের ছাদটি ইন্টার-লকিং পদ্মাকৃতি পাথরে নির্মিত, যা হিন্দুধর্মের সাথে সম্বন্ধ প্রমাণ করে।গম্বুজের পিছনে বৃত্তাকার স্তম্ভের গড়ন খুব আকর্ষণীয়। ওড়িশার বালাসোর জেলার রাইবানিয়া দুর্গের নির্মিতির সাথে এই দুর্গের স্থাপত্যের বহু সাদৃশ্য রয়েছে।স্থানীয় ভাষায় 'কুড়ুম' অর্থ পাথর এবং 'বেরা' মানে বেড়া। এভাবে 'কুড়ুমবেড়া' অর্থাৎ 'পাথর দ্বারা আবদ্ধ একটি এলাকা'। দুর্গটি ১২ ফুট উচ্চ প্রস্তর প্রাচীর দ্বারা ঘেরা । সমগ্র নির্মাণটি ১৭২ ফুট দীর্ঘ এবং ২৫৩ ফুট প্রশস্ত। লাল লেটারাইট বা 'মাকড়া' পাথর কাঠামো নির্মাণের জন্য ব্যবহৃত হয়েছে। তিনটি গোলাকার গম্বুজ রয়েছে - ৩ টি ধাপে ৩ ফুট উঁচু প্ল্যাটফর্মের গম্বুজ গুলি একটি মসজিদ- সদৃশ গঠন পরিগ্রহ করছে। গম্বুজগুলির বিপরীতে ঝুলন্ত মাটি দিয়ে ভরা ছোট পাথরের ঘাটিতে একটি বেদী।সমগ্র অন্তরাঙ্গনটি চারটি পার্শ্বে চলমান 8 ফুট প্রশস্ত খিলানযুক্ত গম্বুজ দিয়ে ঘেরা রয়েছে। এখানে মোট ৬২ টি স্তম্ভ আছে ।স্তম্ভ গুলির আন্তঃদূরত্ব ৬ ফুট ৯ ইঞ্চি। উত্তর দিকে একশিখর-শৈলীর প্রবেশদ্বার। দুর্গের পাশের বিশাল পুকুরটি যোগেশ্বর কুন্ড নামে পরিচিত।লৌহ-নির্মিত বৃহৎ প্রবেশদ্বারটি এখন আর নেই।মসজিদ-এর মতো কাঠামোর পেছনের পশ্চিমাংশ ভেঙে পড়েছে।
কুড়ুমবেড়াকে দুর্গ বলা হলেও একটি আদর্শ দুর্গের মৌলিক বৈশিষ্ট্যগুলির বেশ অভাব লক্ষিত হয়। আভ্যন্তরীণ অংশটি বহু মানুষের সমাবেশের জন্য উপযুক্ত। শিব মন্দিরের প্রকৃত অবস্থানের দুটি তত্ত্ব রয়েছে। কারও মতে, দুর্গের অধীশ্বর মহাদেব এবং সামনের দিকে যোগেশ্বর কুণ্ড, দুর্গের মাঝখানে বর্গক্ষেত্রাকার বেদীটি আসলে শিব মন্দিরের ভিত্তি ছিল; যা পরবর্তীকালে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় ।মন্দিরের শিব লিঙ্গে জল ঢালার জন্য উত্তরের দিকে একটি চ্যানেল রয়েছে।এছাড়াও আরো বহু লোকশ্রুতি চলিত আছে। বলাবাহুল্য, এই শ্রুতি গুলির প্রায় সর্বাংশই মন্দির–মসজিদ বিতর্ক কেন্দ্রিক। লোকমানসের একাংশ বিশ্বাস করেন , বনবাস কালে রামচন্দ্র মাত্র এক রাতে মন্দিরটি নির্মাণ করেন।যাতে রূপান্তরিত মসজিদের তত্ত্বটি খানিকটা সমর্থন পায়। বলাবাহুল্য, নিরপেক্ষ গবেষণা ব্যতিরেকে সিদ্ধান্তে আসা অনুচিত।
রাজনৈতিক ,ধর্মনৈতিক বা সাংস্কৃতিক বিভিন্ন মত প্রসূত বিতর্ক গুলি অক্লেশে অগ্রাহ্য করে প্রাচীনতার স্মৃতি ও গন্ধে ভরপুর খিলানের খাঁজে খাঁজে কান পেতে , বাড়ন্ত সকাল বা নিভন্ত বিকেলের ফিনফিনে হাওয়াকে সঙ্গী করে রহস্যঘন মুহূর্ত গুলিকে আরও দামী করে তুলতে কুড়ুমবেড়ায় আসতেই পারেন। ভালোবাসা জন্মাতেও পারে।




মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন