প্রলাপন
|| ||
(পরিবেশের গরুকে গাছে তোলার প্রয়াস : প্রজন্ম, প্রজন্মান্তরে)
প্রায় তিন দশকেরও অধিক সময় ধরে দেখে আসছি, একই রেকর্ড বছরের পর বছর বাজছে। বারে বারে বাজছে।অবিকৃত , বিকারহীন ভাবে বেজেই চলেছে। 'একটি গাছ, একটি প্রাণ।' , 'গাছ লাগান প্রাণ বাঁচান।'... ইত্যাদি ইত্যাদি। বছরের একটি বিশেষ দিনে, বিশেষ সপ্তাহে এ বাজনা বাড়ে। বহর বাড়ছে। আর সংকটের গহ্বরও বাড়ছে।
আমরা যা শিখেছি, দেখেছি ,করেছি তা বাদই দিলাম। হাবভাবে,বোলে চালে, বিলাসে ব্যসনে আগামী প্রজন্মকে একটা অতি সরল করা অঙ্ক শিখিয়ে যাচ্ছি ... পরিবেশ মানে গাছ । আর শুধু গাছ লাগালেই কেল্লাফতে!
বছরভর বহু গাছ লাগানো হচ্ছে। কিন্তু, কতটা যত্ন নেওয়া হচ্ছে ? যত্ন ,পরিচর্যার ব্যবস্থা থাকলেও ... যে ব্যক্তি, সংস্থা বা কর্তৃপক্ষ গাছ লাগিয়েছেন , ভালোটা যেন তাদেরই হবে ! ... ফাঁকিটা স্বাভাবিক।
বলাবাহুল্য, পরিবেশ মানে শুধুমাত্র 'গাছ' নয়; মানুষ ও তার চারপাশের সব কিছু নিয়েই পরিবেশ। মানুষজন, পশুপাখি, পোকামাকড়, গাছপালা, পাহাড়-পর্বত, জলাশয় পুরো ব্যাপারটা নিয়েই পরিবেশ।
শুধুমাত্র নিম্নবিত্তের পেটের টানে পরিবেশের সাম্য বিঘ্নিত হয়ে চলেছে এমনটা কিন্তু নয়। এটুকু ক্ষয় প্রকৃতি অবলীলায় সহ্য করতেই পারে।কিছু মানুষের সীমাহীন লোভ, আইনী প্রয়োগের বিকলাঙ্গতা ... সর্বোপরী আমাদের স্বার্থ-নমনীয় মানসিকতা এ সভ্যতাকে বিলুপ্তির দিকে দ্রুত এগিয়ে নিয়ে চলেছে।
জলাভূমি বুজিয়ে, জঙ্গল কেটে , পাহাড় গুঁড়িয়ে নির্বিচারে পরিকল্পনাহীন ঘরবাড়ি,ব্যাবসাকেন্দ্র,প্রমোদকেন্দ্র, কলকারখানা নির্মান পরিবেশ ক্ষয়ের বড় কারণ। অন্ধ ভোগবাদী জীবনযাত্রা, ফ্রিজ-এ.সি. ইত্যাদি ভয়ঙ্কর গ্যাস-কেমিক্যাল সম্পন্ন গ্যাজেটের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার, প্রাকৃতিক সম্পদের অপব্যবহার , মোবাইল পরিকাঠামোর অপরিকল্পিত স্থাপনা , যত্রতত্র বর্জ্য ও অসার দ্রব্যের ডাম্পিং পরিবেশের ভারসাম্য বিঘ্নিত করছে। বহু নিয়ন্ত্রক আইন এবং স্বতন্ত্র দপ্তর থাকলেও অর্থ ও স্বার্থের যুগলবন্দীতে সে সমূহ প্রায় সর্বক্ষেত্রে ঠুঁটো জগন্নাথে পরিনত।
তাই উলুবনে মুক্তো ছড়ানো ... সর্বরোগের এক ঔষধি- গাছ লাগানো ... বছর বছর চলছে চলবে ... !
খাল-বিল নদীনালাকে অবরূদ্ধ ও লুপ্ত হতে দেখতে দেখতে, পাহাড়-বালিয়াড়ী ভাঙা দেখতে দেখতে, ফাইলের তলায় উৎকোচ গুঁজে দিতে দিতে ... আমরা আলগোছে আউড়েই যাবো বছর-বছর ... সেই অকেজো চিরপুরাতন নামতা !
প্রাচীন লোকসমাজ তথাকথিত শিক্ষিত ও সভ্য না হলেও, প্রকৃতিকে ... প্রকৃতির মতিগতিকে আন্তরিক অভিজ্ঞতায় বুঝতেন। নিজেদের সসীমতা বুঝে প্রকৃতির সশ্রদ্ধ দাসত্ব করে গেছেন। নিজেকে কখনও বড় ভাবেন নি। বাগাড়ম্বর, আত্মম্ভরীতা নগর সভ্যতা গুলোকে নিশ্চিহ্ন করেছে। পৃথিবী মুছে যায়নি। তার ক্ষতস্থল গুলো আবার পত্রেপুষ্পে ফলময় হয়েছে। প্রকৃতি তার আত্ম-আরোগ্যের মন্ত্র জানে। আমরাও জানি। কিন্তু মানি না।আমাদের গড় আয়ু , পৃথিবীর গড় আয়ু আমরা সব জানি। আর উত্তরপুরুষকে ভালোবাসার ভান করি। সচেতনতার ভুয়ো অ্যান্থেম শেখাই। এটাই সভ্য ও সভ্যতার লক্ষ্মণ!
আমরা জ্ঞানচর্চা করি; বিজ্ঞানে বিজ্ঞ আমরা। বিজ্ঞানের আশীষে আমরা ধন্য। সভ্যতার সাফল্য ফুলে ফেঁপে উঠছে । বিজ্ঞানের সহিংস, স্বার্থের কড়িতে সতত বিক্রি হয়ে যাওয়া আর একটি মুখ আছে। এ মুখটা অনেকটা হালফিলের পলিবুলারির 'স্বতোস্ফূর্ত জনরোষ' এর মতো একটা গোবেচারা শব্দ। যার মুখোশ ছিঁড়ে ফেললে উঠে আসবে কদর্য রাজনৈতিক খুনোখুনির বীভৎস বাস্তব। বিজ্ঞান বা জনমন করেছে যখন ভালোর জন্যই করেছে! বিজ্ঞানের অমিতপ্রয়োগ, ক্রুর ঔপনিবেশিক ঠান্ডা লড়াই, বিশ্বযুদ্ধ - জাতিযুদ্ধ, খ্যাতিযুদ্ধ, স্বার্থ যুদ্ধ - ছোট বড়ো দৈনন্দিন ...খুচরো পাইকারী কতো যুদ্ধ। আমরা ভাবছি প্রতিপক্ষকে শায়েস্তা করছি। প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট করছি। আমরা যুদ্ধ মানি না, তবে পক্ষ মানি । বাজাতে পারি না , তাল ঠুকি। প্রকৃতি নিষ্পাপ শিশু, প্রকৃতি সর্বংসহা সৃষ্টিশীলা নারী। পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করে , গুরুত্বদানের অভিনয় ও উৎসব করি। প্রাকৃতিক দুর্যোগের দায় , ত্রানে 'পরিত্রানপরায়নের' কর্তব্য শুধুমাত্র সরকারের। আমি তো 'সাধারণ মানুষ' ,'নিরীহ পাবলিক' ...আমি কিছু বুঝি না।
হ্যাঁ, মানুষ ও সভ্যতা উভয়েই মরনশীল। স্বাভাবিক মৃত্যু ক'জনেরই বা হয়। এ বিশ্বাসেই বাঁচি।
"এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাবো আমি - " এমন দৃঢ় অঙ্গীকার ও তা পালনের সৎসাহস ক'জনেরই বা আছে! তার চে' বরং গাছ দিয়ে মাছ ঢাকি !

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন