নববার্ষিকীর তেত্রিশ কাহন



বছরের প্রথম দিনটা মাটিতে পড়তে না পড়তেই যেন প্রখর স্রোতের তাড়ায় আগামী তিনশো-চৌষট্টির দ্রুত দিকে গড়িয়ে গেল!দিন গুলোর এত কিসের তাড়া জানি না... এখনকার নববর্ষ গুলোকে কেমন ফাস্ট ফরোয়ার্ডে টেনে যত দ্রুত সম্ভব এড়িয়ে এগিয়ে দেওয়া হয়। তবে 'হ্যাপ্পি ন্যু ইয়ার' এর সেলিব্রেশন-হপ্তা হলে সেটা আলাদা ব্যাপার! এই অবসরে অচল অজর অমর অতীত স্মৃতির আবছায়মান গদ্যেরা কেমন সুরেলা পদ্য হয়ে ওঠে!

এখন আর মাঝ-চৈত্রে ঘিয়ে, লাল, সোনালি, হলুদ রঙা 'কাড়' গুলো ঘরে আসে না। তখন সম্বৎসরের ধারবাকির তাগাদা-লিপি দেখে গৃহস্থেরা খানিকটা তটস্থ হতেন আর আমরা নতুন কার্ডের আনন্দে ডগমগ হতাম। কার বাড়িতে ক'টা কার্ড এসেছে , এ নিয়ে বন্ধুদের মধ্যে রীতিমতো 'বেহায়া' প্রতিযোগিতা লেগে যেতো। আমাদের চোখে ভাসতো... যত গুলো কার্ড,তত গুলো মন্ডা-মিঠাইর হাঁড়ি, তত গুলো ক্যালেন্ডার! গেরস্থের হাঁসফাঁস,আর আমাদের পৌষমাস! 

এই আধবুড়ো বয়েসে এসে সেই সব ছবিওয়ালা ক্যালেন্ডার গুলোর জন্য খুব মন কেমন করে । বিভিন্ন ধর্মীয় ছবি, সিনেমার নায়ক-নায়িকা, সিনারি... কত বৈচিত্র্য। একটা তারিখ বলয়ের ক্যালেন্ডারের জন্য সম্বৎসরের কী আকুল অপেক্ষা। হাতে আঁকা গ্রামীণ কৃষিচিত্র... কৃষ্ণচূড়া, লাঙল-যোয়াল, গরুবাছুর, খাল-বিল-পুকুর-নদী-কুঁয়ো, গৃহস্থ, চাষী, মুনিষ, ছেলেপিলে মিলে এক ভরাট ছবি! ইন্টারনেটের জমানায়, এআইর সার্কাসের ঘেরাটোপে নিরন্তর চেষ্টা করেও এমন একটা 'মানুষ' ... থুড়ি ছবি খুঁজে পেলাম না। এ চাওয়া অতি তুচ্ছ, এবং হাস্যকরও বটে; এ বয়েসে এমন একটা ছবিওয়ালা ক্যালেন্ডার পেলে খুব একটা লজ্জিত হতাম না!

নতুন বছরের প্রাক্কালে ঘট-শিকে জোগাড় করে 'বসন্তঝোরা' তৈরীর উজ্জুগ, পরদিন কাকভোরে ঘরদুয়োরকে ধূঁয়ো দেখানো, গোবর জলে গোয়াল সাফসুতরো করে গরুদের স্নান করিয়ে, শিঙে সিঁদুর-হলুদ লেপে 'ভগবতী' পূজন; বিকেলে দুধ-উথলানো,দুপুরে খাল-বিলের হাঁটু জলে দাড়িয়ে 'গুঁড়ি(ছাতু) শ্রাদ্ধে'র ভোগ-'লিপ্সা'... কলাপাতায় ভেসে আসা ভোগপুঞ্জ জলে ডুবে যাওয়ার আগে ছোঁ মেরে খাওয়ার কাড়াকাড়ি ...

বিকেল গড়ালেই গায়ে সাফ সুতরো জামা গলিয়ে দলে হাতে বাপ-জ্যাঠার আদুরে অ্যাসিস্ট্যান্ট। দোকানে দোকানে বাঞ্ছিত-অবাঞ্ছিত মুখে হাজিরা ... আঙন জুড়ে মিষ্টি-ক্যালেন্ডার! কেউ কেউ তো হালখাতার ক'দিন আগে ইচ্ছে করে ছুটকো ধার রেখে আসতো ... ডাকের আশায়!

বারোমাসে তেরো পার্বণের দেশে চৈত্রের শেষ জুড়ে ধান ভানতে গাওয়া শিবের গীতগুলোকে চড়ক কাঠে তুলে কৃষিকাজের 'পূন্যাহে' ফেরার আগে ছোটোখাটো পুজো দিয়ে বৎসরারম্ভ। ধনলক্ষী সহযোগে সিদ্ধিদাতা গণেশায় নমঃ! ইনি বাঙালির কার্টেনরেইজার গনেশ ... এখনকার চৌষট্টি পার্বণের সর্বভারতীয় লাড্ডুপ্রেমী গণপতিবাপ্পা নন। 

এখন আমাদের কোনও ধার নেই, কিস্তি আছে, ই.এম.আই আছে... হালখাতার আমন্ত্রণ নেই। মুখ ফুটে বলি বা না বলি মাপা ডেসিবেলের 'হা হুতাশ' আছেই! এখন আমাদের খেলার মাঠ, বৈকালিক পিএনপিসির পুকুরঘাট নেই 'সোস্যাল মিডিয়া' আছে। বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের সবচয়ে খতরনাক 'অসামাজিক নারদবাজি, আলপটকা নাকগলানো' শিল্পের সবচেয়ে বড়ো আবেগ-পরিবহন মাধ্যম! এখানে যে যতো হালনাগাদ ( পড়ুন আপডেটেড) , সে ততো বেহাল বেহায়া স্ববিজ্ঞাপক!

অত: কিম ? 
হেপি নভোভরস্যা। চলো 'পিঠে কাটি', চোদ্দশো তেত্তিরিসটা প্রো-দীপ নেভাই! 

© All rights reserved by Tinku Kumar Ghorai 


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

ছেলেমানুষ মেঘেদের স্তবগাথা

প্রলাপ-পঞ্চক

বোধি-বিন্দু ১০