।। বাংলা ভাষা ও কুড়মালীর ভাষিক যোগাযোগ : একটি বীক্ষণ ।।

       
ভারতীয় আর্য ভাষার  উৎপত্তি ও বিকাশের ধারায় বিহারী ভাষার উপশাখা ও ওড়িশার ময়ূরভঞ্জ অঞ্চলের উপভাষা রূপে কুড়মালী (ISO 639-3- kyw ; Glottolog- kudm1238) ভাষার পরিচয় সুবিদিত।মাগধী প্রাকৃতের পূর্বী শাখাদ্ভূত বিহারী-হিন্দী ভাষার ১৯ টি উপশাখা আছে।এদের মধ্যে অঙ্গিকা, মগহী, অবধী, মৈথিলী, কূড়মী অন্যতম। পঞ্চয়গণিয়া (ISO 639-3- tdb ; Glottolog- panc1238) নামে কূড়মালীর আবার সঙ্গী উপরূপ আছে।।কুড়মালী মূলতঃ কূরমীসম্প্রদায়ের মুখের ভাষা।ঝাড়খণ্ডে এদের পদবী মাহতা,মাহতো; পশ্চিমবঙ্গে মাহাত,মাহাতো ; ওড়িশায় মোহান্ত এবং অসমে কুরমী। আভিধানিক ব্যুৎপত্তি অনুযায়ী ‘কূর্ম’ শব্দটি হীনার্থক (কু+ ঊর্মি = হীনগতি)।পুরাণ মতে ‘কূর্ম’ বলতে বিষ্ণুর দ্বিতীয় অবতার অর্থাৎ বরাহকে বোঝানো হয়েছে।সংস্কৃতে ‘কূর্ম’-এর অর্থ ‘কৃষিজীবী’।এই অর্থটিই অধিকতর গ্রহণযোগ্য।
    গ্রীয়ারসন সাহেব কূড়মীদের মধ্যে দক্ষিণ ভারতীয় বৈশিষ্ট লক্ষ্য করেছেন। এইচ. এইচ. রীজ নৃতাত্ত্বিক দৃষ্টিতে কূড়মীদের দ্রাবিড় উপজাতি থেকে আগত বলে মনে করেছেন।নৃতাত্ত্বিকেরা ত্রিস্তরীয় স্থানান্তরণ লক্ষ্য করেছেন। দক্ষিণ ভারত থেকে ওড়িশা-ঝাড়খন্ড-বিহার অঞ্চলে ; এই অঞ্চল থেকে আবার পশ্চিমবঙ্গে কূড়মীদের স্থানান্তরণ ঘটেছে।এরপর জীবিকার টানে অসমের চা বাগান অঞ্চলে স্থানান্তরিত হয়েছে । ১৭৭০ খ্রিস্টাব্দ, ১৮৬৬ খ্রিস্টাব্দ ও ১৮৭২ খ্রিস্টাব্দের দুর্ভিক্ষের ফলে  আড়কাঠিদের প্রলোভনের ফাঁদে পড়ে এদের কিছু অংশ অসমে ছড়িয়ে পড়েন।এরপর বাংলাদেশ , নেপাল প্রভৃতি দেশে কূড়মীদের জীবিকাগত স্থানান্তরণ ঘটেছে।
     পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্ত অঞ্চলে কুড়মালী ভাষার প্রবল বিস্তার ঘটেছে।পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিম মেদিনীপুর, বাঁকুড়া ,পুরুলিয়া জেলার প্রায় ৪০ শতাংশেরও অধিক মানুষ এই সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত।পশ্চিমবঙ্গের এই তিন জেলা ছাড়াও বর্ধমান, মালদা,মুর্শিদাবাদ,দিনাজপুর জেলার পশ্চিমাংশেও কূড়মালী ভাষার উপস্থিতি লক্ষিত হয়।সুবর্ণরেখা ,কংসাবতী, দামোদর ও বৈতরণী নদীর পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে কূড়মালী ভাষা ও সংস্কৃতির প্রসার ঘটেছে।এই ভাষায় কথা বলেন প্রায় দেড় কোটি মানুষ। কুড়মালী ভাষা সাংবিধানিক স্বীকৃতি না পাওয়ায় মাতৃভাষায় শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে বহু সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে।
   ওড়িশার ময়ূরভঞ্জ, কেওনঝড়,সুন্দরগড়, বোনাই অঞ্চলে কূড়মালীর বিশেষ প্রাধান্য আছে।এখানকার বিভিন্ন কূড়মালী শিল্পী-সাহিত্যিকদের মধ্যে আদিকান্দ মাহান্ত অগ্রগণ্য।ইনি কূড়মালীর লোককথা ও লোকগান নিয়ে বহু চর্চা করেছেন।‘কূড়মী কথা’, ‘কূড়মী জন্ম সংস্কার’ প্রভৃতি তাঁর বিখ্যাত রচনা।সন্তোষ কুমার জৈন হিন্দী ভাষায় রচনা করেছেন ‘কূডমালী লোকগীত’।
     ওড়িয়া, হিন্দী , ভোজপুরী, দেহাতি ভাষায় কুড়মালীর গান–কবিতা ,নাটক ইত্যাদি রচিত হলেও বাংলায় এর চর্চা অনেকটাই এগিয়েছে। ঝাড়্গ্রামের জয়ন্ত মাহাতো ইতিমধ্যে কুড়মালী ভাষার নিজস্ব লিপি ‘কুড়মালী চিসই’ নির্মাণ করে ফেলেছেন। জঙ্গলমহলের বর্ষীয়ান লোককবি ভবতোষ মাহাতো কুড়মালীতে রবীন্দ্রনাথের ‘চণ্ডালিকা’ অনুবাদ করেছেন ।পুরুলিয়ার শিক্ষাবিদ ক্ষুদিরাম মাহাতো কুড়মালী সাহিত্যের ইতিহাস ও অভিধান রচনা করেছেন।বিখ্যাত ঝুমুর শিল্পী সলাবত মাহাতোর প্রধান অবলম্বনও কুড়মালী ভাষা।
   অপরদিকে বিভুতিভূষণ ,তারাশঙ্কর,সতীনাথ ভাদুড়ী, মনোজ বসু সুবোধ ঘোষ,তুলসী লাহিড়ী,প্রেমেন্দ্র মিত্র, শৈলজানন্দ, বুদ্ধদেবগুহ, মহাশ্বেতা দেবী প্রমুখের যুগাতিক্রমী লেখায় কূড়মীরা সগৌরবে উপস্থিত।বিভুতিভূষণের ‘আরন্যক’-এ সাধাসিধে বিশ্বাসভাজন গণু মাহাতো ব্রাত্যজীবনের প্রতিনিধি।তারাশঙ্করের ‘কালিন্দী’ উপন্যাসের আলোচনায় ছোটনাগপুর, সাঁওতাল পরগণা ,রাঢ় অঞ্চলের ‘দ্রাবিড় ভাষাভাষী দাসদস্যু’১ বলতে কূরমী-ভূমিজদের দুরবস্থার কথা ব্যক্ত হ্যেছে।ছোটনাগপুর, সাঁওতাল পরগণা ,হাজারীবাগ, ধলভুম, মানভূম অঞ্চলের পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া, ঝাড়গ্রাম, বাঁকুড়া, মেদিনীপুর, বর্ধমান জেলার খেটে খাওয়া অন্তহীন কষ্টে দিন গুজরান ও পদে পদে তাদের ঠকে যাওয়ার ইতিহাস বর্নিত ।ওপার বাংলায় সিলেট জেলার সদর উপজেলার গুলনি ও রাখালগুল, গোয়াইনঘাট উপজেলার রাধানগর, মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া ও শ্রীমঙ্গল উপজেলা ও হবিগঞ্জ জেলার বাহুবল উপজেলায়  কুড়মীরা বাস করেন। ওদেশের  রাধানগরের কুর্মিরা মাহাতো কুর্মি।
  একালের ভগীরথ মিশ্র, নলিনী বেরা,সৈকত রক্ষিত প্রমুখের লেখাতেও কুরমালিকে ভাষাভঙ্গির মুল অবলম্বন হয়েছে।
স্বাধীনতার প্রাক্কালে কুড়মালীদের একাংশের আন্দোলন ছিল ‘ক্ষত্রিয়ায়ণ’ এর বিরুদ্ধে। স্বাধীনতার পর কুড়মালীরা তপসিলী উপজাতি স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য আন্দোলন শুরু করেন। এদের এগোবার পথে  দীপবর্তিকা রূপে কাজ করেছে সাঁওতালি ভাষার আন্দোলন।
বর্তমানে এই আন্দোলন স্বাধীন ভাষার স্বীকৃতি আদায়ের লক্ষ্যে ধাবমান।একদিকে সাংবিধানিক স্বীকৃতির আকুতি ,অন্যদিকে ভাষা-সাহিত্যের ক্রমোন্নয়ন কুড়মালী ভাষাকে আধুনিক ভারতের বিশেষ চর্চার বিষয় করে তুলেছে। চুনারাম মাহাতো, অভিমন্যু মাহাতো, সুনীল মাহাতোদের শক্তিশালী লেখনী ভারতীয় সাহিত্য-সম্ভারকে আরো সমৃদ্ধ করে তুলছে।
বঙ্গভূমির কুড়মালী ভাষায় বাংলার ঝাড়খন্ডী উপভাষা, অস্ট্রিক জাতির সংস্কার ও ভাষা , ওড়িয়া, বিহারী-ভোজপুরী হিন্দীর প্রবল প্রভাব আছে।

 কুড়মালী ভাষায় রবীন্দ্রসঙ্গীতলেখা হচ্ছে ।প্রশ্ন চঞ্চল হচ্ছে – কুড়মালী কী শুধুমাত্র কয়েকটি রাজ্যের উপভাষা হয়েই থাকবে, লোকভাষা  না স্বতন্ত্র ভাষার সম্মানে ভূষিত হবে!

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

ছেলেমানুষ মেঘেদের স্তবগাথা

প্রলাপ-পঞ্চক

বোধি-বিন্দু ১০