বনের গহন হতে সমৃদ্ধ মননে পুষ্পিত একটি বিচিত্র কুসুমঃ বনফুল


(বনফুলের জীবন ও সাহিত্য)
অধ্যাপক টিংকু কুমার ঘোড়াই
সহকারী অধ্যাপক
প্রধান, বাংলা বিভাগ
গৌরব গুঁইন মেমোরিয়াল কলেজ
চন্দ্রকোনা রোড , পশ্চিম মেদিনীপুর
............................................................................................................................................................................................................
 বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়  (জন্ম: ১৯ জুলাই, ১৮৯৯ - মৃত্যু: ৯ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭৯) বাঙালি কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার ও কবি। তিনি বনফুল ছদ্মনামেই অধিক পরিচিত। পেশায় চিকিৎসক।অবিভক্ত ভারতবর্ষের বিহার রাজ্যের মনিহারীতে তিনি জন্মগ্রহণ করেন।কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, কবি।বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়ের পিতার নাম ডাঃ সত্যনারায়ণ মুখোপাধ্যায় ও মাতা মৃণালিনী দেবী। তাদের আদি নিবাস হুগলী জেলা শিয়াখালা।কিন্তু তিনি বিহারের পূর্ণিয়া জেলার মণিহারী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। অনুজ অরবিন্দ মুখোপাধ্যায় খ্যাতনামা চিত্রপরিচালক।
   শিক্ষা ও কর্মজীবন
   প্রথমে মণিহারী স্কুলে এবং পরে সাহেবগঞ্জ জেলার সাহেবগঞ্জ উচ্চ ইংরেজী বিদ্যালয়ে তিনি লেখাপড়া করেন। শেষোক্ত স্কুল থেকে ১৯১৮ খ্রিস্টাব্দে প্রবেশিকা (এন্ট্রান্স) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে তিনি আই.এস.সি, পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন হাজারীবাগ সেন্ট কলম্বাস কলেজ থেকে। কলকাতা মেডিকেল কলেজে চিকিৎসা শাস্ত্র অধ্যয়ন করেন তবে পাটনা মেডিক্যাল কলেজে থেকে এম.বি, ডিগ্রী লাভ করেন। প্যাথলজিস্ট হিসাবে ৪০ বৎসর কাজ করেছেন। ১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দ থেকে স্থায়ীভাবে কলকাতায় বসবাস করতে শুরু করেন। ১৯৭৯ খ্রিস্টাব্দের ৯ ফেব্রুয়ারি তারিখে কলকাতা শহরে তাঁর মৃত্যু হয়।

    বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় কৈশোর থেকেই লেখালেখি শুরু করেন। শিক্ষকদের কাছ থেকে নিজের নাম লুকোতে তিনি বনফুল ছদ্মনামের আশ্রয় নেন। ১৯১৫ খ্রিস্টাব্দে সাহেবগঞ্জ স্কুলে পড়ার সময় মালঞ্চপত্রিকায় একটি কবিতা প্রকাশের মধ্য দিয়ে তাঁর সাহিত্যিক জীবনের সূত্রপাত ঘটে। শনিবারের চিঠি তে ব্যঙ্গ কবিতা ও প্যারডি কবিতা লিখে সাহিত্য জগৎতে নিজের আসন স্থায়ী করেন। এছাড়াও নিয়মিত প্রবাসী, ভারতী এবং সমসাময়িক অন্যান্য পত্রিকায় ছোটগল্প প্রকাশ করেন।বনফুল হাজারেরও বেশি কবিতা, ৫৮৬টি ছোট গল্প, ৬০টি উপন্যাস, ৫টি নাটক, জীবনী ছাড়াও অসংখ্য প্রবন্ধ রচনা করেছেন। তাঁর রচনাবলী সমগ্র ২২ খণ্ডে প্রকাশিত।
কবিতা – বনফুলের কবিতা/১৯২৩।
উপন্যাস -৬০ টি
প্রথম – তৃণখণ্ড > শেষ –সন্ধিপূজা।
১।।কল্পনা ও কাব্যধর্মী -১৯৩৫/তৃণখণ্ড।মৃগয়া/১৯৪০।ডানা/১৯৪৮।।লক্ষ্মীর আগমন/১৯৫৪ ।মানসপুর/১৯৬৬।অসংলগ্না/১৯৭৯। লী-১৯৭৮।
২।।সামাজিক -বৈতরণীর তীরে/১৯৩৬।।কিছুক্ষণ/১৯৩৭। নির্মোক /১৯৪০। জঙ্গম/ ১৯৪৩-৪৫।উদয় অস্ত /১৯৫১।ভুবন সোম/১৯৫৭। জলতরঙ্গ /১৯৫৯। হাটেবাজারে /১৯৬১। জনাসু /১৯৬২। তীর্থের কাক /১৯৬৮। অধিককাল /১৯৬৯।  রৌরব /১৯৭০। এরাও আছে /১৯৭২। নবীন দত্ত /১৯৭৪। হরিশ্চন্দ্র/১৯৭৯।
৩।।রাজনৈতিক - সপ্তর্ষি/১৯৪৫। অগ্নি/ ১৯৪৬। স্বপ্নসম্ভব/১৯৪৭। মানদন্ড/ ১৯৪৮। প্রচ্ছন্ন মহিমা/১৯৫৩। ত্রিবর্ণ/১৯৬৩। তুমি/১৯৭১।
৪।।পুরানকেন্দ্রিক - পিতামহ/১৯৫৪। রূপকথা ও তারপর /১৯৭০। সাত সমুদ্র তেরো নদী /১৯৭৬।
৫।।ইতিহাসাশ্রয়ী – স্থাবর /১৯৫১। নিরঞ্জনা/১৯৫৫। গল্পবাজ /১৯৬৬। ।গোপালদেবের স্বপ্ন /১৯৬৮। কষ্টিপাথর/১৯৭১ সন্ধিপূজা/১৯৭২।প্রথম গরল/১৯৭৪।
৬।।মনস্তাত্ত্বিক –রাত্রি/১৯৪১।  সে ও আমি/১৯৪২।পক্ষীমিথুন/১৯৬৪।কৃষ্ণপক্ষ/১৯৭২।
৭।।চিকিতসক জীবন – অগ্নীশ্বর /১৯৫৯।বৈতরণীর তীরে। উদয়- অস্ত। হাতেবাজারে। নির্মোক।
৮।।বিচিত্র সমস্যা নির্ভর- দ্বৈরথ/১৯৩৭। নঞতৎপুরুষ/১৯৪৬।  ভীমপলশ্রী /১৯৪৯।  ।নবদিগন্ত/১৯৪৯।পঞ্চপর্ব /১৯৫৫। বিষম জ্বর /১৯৫৫। উজ্জ্বলা/১৯৫৫। মহারাণী/১৯৫৮ দুই পথিক/১৯৬০।ওরা সব পারে/১৯৬০। সীমারেখা/১৯৬২।পীতাম্বরের পুনর্জন্ম/১৯৬৩।গ্নধ্রাজ/১৯৬৬।  রঙ্গতুরঙ্গ/১৯৭০।আশাবরী/১৯৭৪।অলকাপুরী/১৯৭৮।
ছোট গল্প সঙ্কলন
প্রায় ৬০০-র বেশী গল্প রচনা করেন।
পোস্টকার্ড স্টোরির জনক। এধরনের গল্পকে কেউ বলেছেন ‘Five Minutes’। বুদ্ধদেব বসু এ ধরণের গল্পকে বলেছেন ‘এক চুমুক’।
প্রতিবাদ স্বাধীনতা । বনফুলের গল্প/১৯৩৬ ।বনফুলের আরো গল্প/১৯৩৮ ।বাহুল্য/১৯৪৩ ।বিন্দু বিসর্গ /১৯৪৪ ।অদৃশ্যলোক /১৯৪৬।  অনুগামিনী/১৩৬৪। তন্বী/১৯৫২ । নবমঞ্জরি/১৯৫৪ । ঊর্মিমালা /১৯৫৫। সপ্তমী/১৩৬৭। দূরবীন /১৩৬৮। মণিহারী /১৩৭০ । এক ঝাঁক খঞ্জন/১৯৬৭। বহুবর্ণ/১৩৮৩।  বনফুলের  নতুন গল্প /১৯৭৬।বনফুলের শ্রেষ্ঠ গল্প। বনফুলের গল্প সংগ্রহ – ১।বনফুলের গল্প সংগ্রহ -২ । বনফুলের ছোট গল্প সমগ্র ১ ও ২। ফুলদানীর একটি ফুল।রঙ্গনা। করবী/৫৮। ছিটমহল/৬৫। অদ্বিতীয়া /১৯৭৫  বনফুলের শেষ লেখা /১৯৭৫।
আত্মজীবনীঃ -   পশ্চাদপট ।
নাটক
বনফুল ছিলেন জীবনী-নাটকের পথিকৃৎ।
শ্রীমধুসূদন /১৯৩৯। বিদ্যাসাগর/১৯৪১। রুপান্তর /১৯৩৪।কঞ্চি/১৯৪৫।
চলচ্চিত্রায়িত রচনা – অগ্নীশ্বর , ভুবন সোম ,একটি রাত , আলোর পিপাসা , হাটেবাজারে , অর্জুন পণ্ডিত (ফিল্মফেয়ার পুরস্কারপ্রাপ্ত কাহিনী), তিলোত্তমা , পাকাদেখা।
সম্মাননা
তাঁর সাহিত্যকর্মের জন্য তিনি 'পদ্মভূষণ' উপাধি লাভ করেন। এছাড়াও তিনি শরৎস্মৃতি পুরস্কার (১৯৫১), রবীন্দ্র পুরস্কার (১৯৬২), বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের জগত্তারিণী পদক (১৯৬৭)। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ডিলিট উপাধি প্রদান করে ১৯৭৩ সালে। তাঁর জন্ম শতবর্ষে ভারত সরকার বিশেষ ডাক টিকিট প্রকাশ করেন।
মৃত্যু -কলকাতায়, ৯ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৯ ।
তথ্যসূত্র
১) ক খ গ ঘ হংসনারায়ণ ভট্টাচার্য বিরচিত বঙ্গসাহিত্যাভিধান, ২য় খণ্ড, ১৯৯০ খ্রি.২) সেলিনা হোসেন ও নুরুল ইসলাম সম্পাদিত; বাংলা একাডেমী চরিতাভিধান; ফেব্রুয়ারি, ১৯৯৭; পৃষ্ঠা- ২৪৪।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

ছেলেমানুষ মেঘেদের স্তবগাথা

প্রলাপ-পঞ্চক

বোধি-বিন্দু ১০