কুড়োনো কথারা

|| হেমন্তের হয়ে ||

         ঋতুর মৃত্যু না মৃত্যুমুখী ঋতু এ চিত্তচাঞ্চল্য শরতের প্রান্ত দিনগুলোয় জন্ম নেয়। বিশেষতঃ কুয়াশাকীর্ন ভোর গুলোয়, ম্যাড়ম্যাড়ে বিকেল ডিঙোনো প্রাক্ সন্ধ্যা গুলোয়। দুপুর গড়ালেই দিনের হৃদয়ের ওম কেমন শ্রীহীন হতে হতে নিভতে শুরু করে। যেন মহাপরিনির্বান যাত্রা!তবে বুদ্ধত্বপ্রাপ্তির তপশ্চর্যার মত পুরোপুরি নির্মোহও নয়। হাহুতাশহীন মসৃণ ডিঙিগতির জীবন। পাকা ধান কাটার খেতের লাগোয়া জীবনের তরলে সিক্ত শাপলা শালুকের ভাসার বেলা। জীবন অমরত্বের নয়। তবু জগত ও জীবনকে আরও কয়েক মুঠো স্মৃতির রসদ দিয়ে যেতে পারা।
         জীবনানন্দ ছোঁবার পর তাঁর প্রিয় ঋতুর মুখ আরও স্পষ্ট হয়ে ধরা দিতে শুরু করে। ফসল কর্তিত নির্জন খড়ের মাঠে পেঁচার পাখনা বিস্তারের চাঁদনি রাত;নরম নদীর নারীর আবছা আলোয় কুয়াশার ফুল ছড়ানোর গল্প। হিজলের কলি দুলোবার দিন। ছাতিমের নেশালু ঘ্রাণে সন্ধ্যার নিশিগামিতা। গাছে গাছে ধুঁধুঁলের চাদর টাঙানো।আকাশমনির জঙ্গলের গায়ে ফুলেল হলুদ ধানছড়া আল্পনা।এ ঋতু যেন মৃত্যুর আগের সীমারেখা। প্রৌঢ়ত্বের প্রায়শ্চিত্তে নয়, খেলা শেষের আগের 'একস্ট্রা টাইম' ; চেটে পুটে উপভোগের ঋতু। আত্মহত্যার বাসনা বা মৃত্যুভয় কোনো বৈশিষ্ট্যই নেই এখানে। একই ডালে নতুনের পাশে পুরোনো পাতা বেমানান। তাকে ঝরতেই হবে!ঝরতে হয়। অফুরান প্রাণের দেদার ঝরে যাওয়া।
         বৎসরের অন্তের খবর বয়ে আনা হিমের ঋতু! কারো চোখে এ মৃত্যুর পরোয়ানা বাহক, অনেকটা শ্রীরাধার প্রেমের খেলা জুড়োবার নাটের গুরু অক্রুরের মত! 'নামহি অক্রূর ক্রূর নাহি যা সম।...' সত্যকথা, শেষকথা, খেলাশেষের কথা বলবার দ্বায়িত্ব কাউকে না কাউকে নিতেই হয়! শমণ উচ্চারণে তার নিজেরও কম কষ্ট হয় না। কারণ শেষ ব্যাপারটা অনাড়ম্বর ঢাক ঢোল পিটিয়ে সমাপ্তি সঙ্গীত গাইবার মত অবকাশহীন।রোমান্টিক সন্ধ্যাভাষার কুয়াশার জাল ছড়াবার এ হিমবন্ত দিন।শরতান্তে হিমের পরশ , দুরুদুরু চিরোল আমলকী পাতাদের মাথা দোলানোর বেলা। লতায় পাতা ঘাসে ঘাসে অযুত অনামিকা রঙিন ছোটো ছোটো ফুলেরা পিটিপিটি হাসে। একরাশ উড়োচিঠি হাতে হেমন্তের অরণ্যে ডাকহরকরা পথ খোঁজে এখনও ; তোমার চিঠিটা বুঝে নিও  ,বন্ধু!

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

ছেলেমানুষ মেঘেদের স্তবগাথা

প্রলাপ-পঞ্চক

বোধি-বিন্দু ১০